হাওজা নিউজ এজেন্সি: আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি তাঁর এক নৈতিক শিক্ষার দারসে “ব্যক্তিগত প্রশান্তি, সামাজিক সুস্থতা ও গণমাধ্যমের সঠিক দিকনির্দেশনায় তাওহিদের ভূমিকা” বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। সেই বক্তব্যের সারাংশ নিচে তুলে ধরা হলো:
তাওহিদ ও মানসিক প্রশান্তি
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন,
তাওহিদ মানুষকে দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত করে; এমনকি—আল্লাহ না করুন—আত্মসাৎ, অস্বাভাবিক উচ্চ বেতন, ঘুষ, সুদ, গোপন লেনদেন ও অন্যান্য আর্থিক অপরাধ থেকেও রক্ষা করে।
তিনি এ প্রসঙ্গে ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর একটি আলোকোজ্জ্বল বাণী উদ্ধৃত করেন—
مَنْ أَصْغی إِلی ناطِق فَقَدْ عَبَدَهُ، فَإِنْ کانَ النّاطِقُ عَنِ اللّهِ فَقَدْ عَبَدَ اللّهَ، وَ إِنْ کانَ النّاطِقُ یَنْطِقُ عَنْ لِسانِ إِبْلیسَ فَقَدْ عَبَدَ إِبْلیسَ
“যে ব্যক্তি কোনো বক্তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, সে মূলত তারই ইবাদত করে। যদি বক্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বলে, তবে সে আল্লাহর ইবাদত করেছে; আর যদি সে শয়তানের ভাষায় কথা বলে, তবে সে শয়তানের ইবাদত করেছে।”
এই বাণী আমাদের সবাইকে—বিশেষ করে বর্তমান তথ্য ও যোগাযোগের যুগে—সতর্ক করে দেয় যে, আমরা কার কথা শুনছি এবং কী গ্রহণ করছি, সে বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন থাকা জরুরি।
গণমাধ্যম: ভার্চুয়াল নয়, বাস্তব পরিবেশ
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, বহুবার বলা হয়েছে—এই পরিসরকে ‘ভার্চুয়াল’ বা অবাস্তব বলা সঠিক নয়। কারণ সত্য কোনো তারের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয় যে তারবিহীন হলে তা অবাস্তব হয়ে যাবে; আবার টেলিভিশনের পর্দাও বাস্তবতার একমাত্র বাহক নয়।
যেখানে চিন্তা, বিশ্বাস ও ধারণা আদান–প্রদান হয়, সেই পরিবেশই বাস্তব। অতএব, ডিজিটাল ও গণমাধ্যমের জগৎও একটি বাস্তব পরিসর, যার প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজের ওপর গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
তিনি বলেন, মানুষ যখন কোনো বই পড়ে, কোনো দৃশ্য দেখে, কোনো চলচ্চিত্র দেখে বা কারও কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তখন প্রকৃতপক্ষে সে তাকে অনুসরণ ও ‘ইবাদত’ করে। যদি সেই বিষয়বস্তু আল্লাহ ও রাসূলের কথা বলে, তবে সে আল্লাহ ও রাসূলের ইবাদত করছে; আর যদি তা ভোগবাদী, অসার বা বিভ্রান্তিকর চিন্তা প্রচার করে, তবে সে সেগুলোকেই গ্রহণ ও অনুসরণ করছে।
রিযিক বিষয়ে তাওহিদের দৃঢ় বিশ্বাস
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি হযরত আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করেন।
হযরত আবু যার (রা.)-কে যখন রবাযাহ অঞ্চলে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছিল, তখন ইমাম আলী (আ.) তাঁকে বলেন— “আবু যার! রবাযাহ এমন এক স্থান, যেখানে না পানি আছে, না বাসযোগ্য পরিবেশ। কিন্তু জেনে রেখো— যদি গোটা পৃথিবী এমন হয়ে যায় যে কোথাও ফসল না জন্মায় এবং আকাশ থেকে এক ফোঁটা বৃষ্টিও না নামে, তবুও আল্লাহ তাঁর বান্দাকে রিযিক ও জীবিকা দান করতে সক্ষম।”
এই বিশ্বাসই হলো প্রকৃত তাওহিদ। এমন তাওহিদে বিশ্বাসী মানুষ সম্পূর্ণ নির্ভার ও প্রশান্ত হয়ে যায়। আবু যার (রা.) উত্তরে বলেন, তিনি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ও দৃঢ়।
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি বলেন, ইমাম জাওয়াদ (আ.) থেকেও এ ধরনের বহু তাওহিদপূর্ণ বাণী বর্ণিত হয়েছে।
তাওহিদ ও সামাজিক শুদ্ধতা
এই তাওহিদই মানুষকে দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের পাশাপাশি—আল্লাহ না করুন—ঘুষ, সুদ, আত্মসাৎ ও অবৈধ আয়ের পথ থেকে রক্ষা করে। কারণ প্রকৃত তাওহিদ বিশ্বাসী জানে যে, সমস্ত হালাল রিযিক একমাত্র আল্লাহ তাআলার নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ যত বেশি জ্ঞানী হবে এবং যত বেশি খাঁটি নিয়তের অধিকারী হবে, তার কথার প্রভাব তত গভীর হবে। সমাজ বক্তা বা আলেমের কথা ও কাজের মাঝে অসঙ্গতি দেখলেও দ্বীনের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না; বরং বলে—ব্যক্তির আচরণ ভুল হতে পারে, কিন্তু দ্বীন ভুল নয়।
আলেমদের প্রতি দায়িত্ব ও করণীয়
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলি আলেমদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা দ্বীনের পথপ্রদর্শক। চেষ্টা করুন, মসজিদগুলো যেন সবসময় কুরআন ও আহলুল বাইত (আ.)-এর রেওয়ায়াতভিত্তিক, জ্ঞানসম্মত ও গভীর বক্তব্যে পরিচালিত হয়। এতে একদিকে আপনার বক্তব্য নিজের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলবে, অন্যদিকে সমাজেও তা স্থায়ী ও ইতিবাচক পরিবর্তন সৃষ্টি করবে।
তারিখ: ১৮ মুর্দাদ ১৩৯৭ হিজরি শামসি (৯ আগস্ট ২০১৮)
আপনার কমেন্ট